প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে আলোচনায় এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় সমাধান—মন্ত্রণালয় একীভূত করা। যুক্তিটা সরল: মন্ত্রণালয় কমলে ব্যয় কমবে, আমলাতন্ত্র সঙ্কুচিত হবে, সিদ্ধান্ত হবে দ্রুত। কিন্তু এই ধারণা সমস্যার গভীরে যায় না। এটি সিস্টেমিক জটিলতার বদলে কেবল দৃশ্যমান কাঠামো নিয়ে কাজ করে।
মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানো সংস্কারের লক্ষ্য হতে পারে না। একটি ভবনের কক্ষ কমালেই যদি ভেতরের দরজাগুলো বন্ধ থাকে, তাহলে কাজের গতিশীলতা বাড়ে না। আমাদের প্রয়োজন সংখ্যাগত সংকোচন নয়, কার্যকর ও অভিযোজিত (adaptive) প্রতিষ্ঠান—একটি এজাইল সরকার, যা পোস্ট-অ্যানালগ যুগের জটিল বাস্তবতায় দ্রুত সাড়া দিতে পারে।
স্থবিরতার প্রকৃত উৎস: ‘অ্যালোকেশন অফ বিজনেস’
আমাদের প্রশাসনিক জটিলতার মূল উৎস মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা নয়; বরং ‘অ্যালোকেশন অফ বিজনেস’ (AoB) নামের সেই কাঠামো, যা কাজের বণ্টননামা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হয়ে উঠেছে সীমারেখার প্রাচীর।
এই দলিল আজ এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ভিত্তি হয়ে গেছে, যেখানে ‘এটা আমাদের ম্যান্ডেট নয়’—এই বাক্যটি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ অস্ত্র।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। আমরা একসময় কল সেন্টারের মাধ্যমে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ও কনস্যুলার সহায়তা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আপত্তি এল—সেবার মান নিয়ে নয়, বরং এখতিয়ারের প্রশ্নে।
আবার যখন আন্তর্জাতিক একটি সিএসও’র অর্থায়ন ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের স্কিল ভেরিফিকেশন চালু করতে চাইলাম, তখন আপত্তি এলো ম্যান্ডেট নিয়ে—কার কাজ কার। ফলাফল? উদ্যোগ স্থগিত। সমস্যা রয়ে গেল।
এইভাবে ‘অ্যালোকেশন অফ বিজনেস’ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে স্থবিরতার এক অলিখিত সংবিধানে।
‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’-এর ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, সমাধান হলো আরও বড় কর্তৃত্ব—একজন শক্তিশালী সমন্বয়ক বা সুপার-অ্যাডজুডিকেটর, যিনি সব বিরোধ মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু জটিল সিস্টেমে বেশি স্তর মানেই বেশি সমাধান নয়। বরং নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রে নতুন ‘টার্ফ ওয়ার’ তৈরি হয়।
কমপ্লেক্স সিস্টেম স্টাডিজ আমাদের শেখায়—জটিল বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সরল, সুস্পষ্ট নিয়ম দরকার। যেমন অর্থনীতিতে আমরা প্রতিটি লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করি না; কেবল সুদের হার নির্ধারণ করি, আর বাকি গতিশীলতা সিস্টেম নিজেই সৃষ্টি করে।
আমলাতন্ত্রও তেমনই একটি জটিল সিস্টেম। এখানে ওপর থেকে কৃত্রিম পুনর্গঠনের বদলে ভেতরের প্রেষণা বা ইনসেন্টিভ বদলানো জরুরি।
একচেটিয়া সেবা-অধিকার থেকে প্রতিযোগিতামূলক মডেল
বর্তমান AoB মডেল প্রতিটি সেবাকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একচেটিয়া সম্পত্তি বানিয়েছে। ফলে সেই প্রতিষ্ঠান অদক্ষ হলে পুরো সেবাটাই আটকে যায়।
সংস্কারের মূল চাবিকাঠি হতে পারে এখানেই—একচেটিয়া ক্ষমতা ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো আনা।
অ্যালোকেশন অফ বিজনেস থাকবে, কিন্তু ‘এক্সক্লুসিভ রাইট’ হিসেবে নয়—বরং প্রাইমারি গাইড হিসেবে।
ক্যাবিনেট ডিভিশন একটি সাধারণ রেগুলেশন আনতে পারে:
- প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রাথমিক দায়িত্ব থাকবে;
- কিন্তু প্রয়োজনে তারা সেকেন্ডারি ফাংশন গ্রহণ করতে পারবে;
- যদি কোনো মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট সেবা দ্রুততর, প্রযুক্তি-সমর্থিত ও বাইরের অর্থায়নে দিতে সক্ষম হয়, তবে তাদের সেই সুযোগ পেতে হবে।
এভাবে সরকার নিজস্ব ভেতরেই একটি দক্ষতার বাজার তৈরি করতে পারে।
দক্ষতার টিকে থাকা: ‘Survival of the Efficient’
ম্যান্ডেট-কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের ধারণা অবিশ্বাস তৈরি করবে—কারণ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণই সেখানে ক্ষমতার ভিত্তি।
কিন্তু ১৯ শতকের অর্গানাইজেশন চার্ট দিয়ে ২১ শতকের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
যদি সেবার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, তবে যে প্রতিষ্ঠান কার্যকর হবে, স্বচ্ছতা দেখাবে, প্রযুক্তি ব্যবহার করবে—তাদেরই টিকে থাকার যুক্তি শক্ত হবে। অদক্ষদের জোর করে ‘মার্জ’ করার প্রয়োজন হবে না; প্রাসঙ্গিকতা হারালে তারা নিজেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে।
উপসংহার: সিলো নয়, প্ল্যাটফর্ম সরকার
প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সরকার, যা সমস্যাকে আটকে দেয় না—সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে শেখে।
মন্ত্রণালয়গুলোকে আলাদা সিলো নয়, বরং সেবা প্রদানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভাবতে হবে।
ডেস্কগুলো একত্র করলেই হবে না; ম্যান্ডেটের তালা খুলতে হবে।
অ্যালোকেশন অফ বিজনেসের একচেটিয়া কাঠামো ভাঙতে পারলে তবেই আমরা এমন একটি গতিশীল প্রশাসন গড়ে তুলতে পারব, যা দেশের মানুষের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম।